All Bangla News

রিফুংজাং: মারমা ঐতিহ্যের যে পান্থশালা এখনো টিকে আছে

abn
abn

পাহাড়ি পথের ধারে শণের ছাউনি দেওয়া ঘর। চারপাশে খোলা, ঘরে কোনো বেড়া নেই। ভেতরে মাটির কলসিতে রাখা আছে বিশুদ্ধ শীতল পানি। পথ দিয়ে হেঁটে চলা পথিকেরা চাইলেই সেই পানি পান করে ক্লান্তি দূর করতে পারেন। এমনকি ঘরের ভেতর গা এলিয়ে দিয়ে নিতে পারেন ক্ষণিকের বিশ্রাম।

ঘরটির নাম রিফুংজাং। মারমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই পান্থশালা। পাহাড়ি জনপদে একসময় প্রতিটি মারমা পাড়া বা গ্রামের পাশে দেখা যেত রিফুংজাং। সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রিফুংজাং কমতে শুরু করলেও এখনো কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় দেখা মেলে এ ধরনের পান্থশালার।

একসময় পাহাড়ি অঞ্চলে জনবসতি কম ছিল। এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় যেতে পাড়ি দিতে হতো দীর্ঘ পথ। সবুজ বনাঞ্চল, পাহাড়, নদী, খাল ও ঝিরি পাড়ি দিয়ে চলাচল করতেন বাসিন্দারা। স্বাভাবিকভাবেই যাত্রাপথে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন তাঁরা। বিশেষ করে যাঁরা তুলনামূলক দূরের পথে যেতেন, তাঁদের ক্লান্তি দূর করার জন্য প্রয়োজন হতো মাঝপথে বিশ্রামের। এসব পথিকের জন্য জনহিতকর কাজ হিসেবে রিফুংজাং গড়ে তোলার প্রচলন হয়।

রিফুংজাং সাধারণত কোনো পাড়ার আশপাশে ওই পাড়ার তরুণ-তরুণীরা নির্মাণ করেন। গাছ ও বাঁশ দিয়ে প্রথমে কাঠামো নির্মাণ করে এর ওপর শণের ছাউনি দেওয়া হয়। অতি সাধারণ ঘরটি সাধারণত নদী-খাল বা ঝিরির পাড়ে করা হয়। যার কারণে বর্ষায় পানির স্রোতে ভেসে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। সে ক্ষেত্রে বর্ষা মৌসুম শেষে আবার তরুণ-তরুণীরা একতাবদ্ধ হয়ে একই স্থানে রিফুংজাং নির্মাণ করেন। বংশপরম্পরায় স্মরণাতীতকাল থেকে মারমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই মানবিক সংস্কৃতির চর্চা হয়ে আসছে।

সম্প্রতি থানচি উপজেলার বলীপাড়া ইউনিয়নের নাইক্ষ্যংপাড়া এলাকায় দেখা মেলে একটি রিফুংজাং। সেখানে ক্লান্ত পথচারীদের মাটির কলসিতে রাখা পানি পান করতে দেখা যায়। কেউ আবার গা এলিয়ে সেখানে বিশ্রাম করছেন। রিফুংজাংয়ে কথা হয় মারমা নারী চিংয়ই প্রু মারমার সঙ্গে। তিনি বলেন, পাড়ার তরুণ-তরুণীরা রিফুংজাং পরিচালনা করেন। রিফুংজাংয়ে রাখা মাটির কলসির পানি শেষ হলে তরুণ-তরুণীরা আবার সেটি পূর্ণ করেন। কলসি নষ্ট হচ্ছে কি না, গ্লাস হারিয়ে গেল কি না—সেসবের খোঁজখবরও নিয়মিত রাখেন তাঁরা।

নাইক্ষ্যংপাড়ার প্রবীণ মংচসিং মারমা বলেন, রিফুংজাং হলো প্রশান্তির জায়গা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে তৃষ্ণার্ত পথিকের যখন বিশ্রাম ও পানীয়ের প্রয়োজন হয়, তখন রিফুংজাংয়ের মাটির কলসির শীতল পানিতে পথিকেরা প্রাণশক্তি ফিরে পান। মাটির কলসিতে পানি শীতল থাকে, তাই মাটির কলসি ছাড়া রিফুংজাং ঘরে পানি রাখা হয় না। তিনি আরও বলেন, রিফুংজাং ক্ষণিক বিশ্রামের জন্য হলেও কোনো দূরগামী পথিক চাইলে সেখানে নিরাপদে রাতযাপন করতে পারেন।

রিফুংজাংয়ের ঐতিহ্য কবে থেকে শুরু সে সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পাওয়া যায়নি। বৌদ্ধভিক্ষু উ ক্যসাহ্লা থেরর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গৌতম বুদ্ধের সময়ে বারানসিরাজ প্রসেনজিৎ মানুষের গমনাগমনের সুবিধার্থে তরুণ-তরুণীদের উদ্বুদ্ধ করে রিফুংজাং শুরু করেছিলেন। এতে ক্ষণিক বিশ্রাম ও মাটির কলসির শীতল পানি পান করে ক্লান্ত পথিকের মধ্যে প্রশান্তি ফিরে আসে। দূরগামী পথিকেরা রিফুংজাংয়ে রাতযাপন করে পরে আবার গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিতে পারেন। আশ্রয় ও পানীয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পথিকদের তৃপ্ত হৃদয় থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়, তাঁরা সবার মঙ্গল কামনা করেন।

Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *